গণমাধ্যম নিয়ে কিছু কথা!

শিল্পী যখন শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে গান পরিবেশন করে তখন সেই গান কারো হৃদয় ছুঁয়ে যায় আবার কারো কাছে সেটা তিক্ত মনে হয়। কথায় বলে, গান মানুষের কষ্টের ক্ষুধা নিবারণ করে। তবে সেই ক্ষুধা নিবারণকারী টনিক যদি রসাত্মক না হয়ে ব্যাঙ্গাত্মক হয় সে ক্ষেত্রে হিতে বিপরীত হয়। এটা যে শুধু শিল্পীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য তা নয়, সব ক্ষেত্রেই এটি বিদ্যমান।

এবার আসি মূল কথায়, বর্তমানে বাংলাদেশ তথা আমাদের দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা নেহাত কম নয়। আর কমবেশি সবারই দৃষ্টি এখন গণমাধ্যমের দিকে। সেটি টেলিভিশন, রেডিও, দৈনিক পত্রিকা কিংবা অনলাইন পত্রিকা হোক না কেন?

এদিকে তথ্যমন্ত্রণালয়ের সূত্র মতে, বাংলাদেশে ৪৪টি টেলিভিশন, ২২টি এফএম, ৩২টি কমিউনিটি রেডিও, ১১৮৭টি দৈনিক পত্রিকা ও ১০০টিরও বেশিও অনলাইন পত্রিকার অনুমোদন রয়েছে। আর ৩০ টির মত টেলিভিশন বর্তমানে সম্প্রচার কার্যক্রমে রয়েছে।

বলা যায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়ছে। তবে এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যে হারে পাল্লা দিয়ে গণমাধ্যমের সংখ্যা বাড়ছে সে হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে কি না? আর গণমাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ হলেও সেখানে কারা সুযোগ পাচ্ছে। গণমাধ্যমে দক্ষ কিংবা যোগ্য ব্যক্তিরা কাজের সুযোগ পাচ্ছেন কি না সেটা দেখার বিষয়?

গণমাধ্যমে কাজ করার সৌভাগ্য মানে অন্য কিছু। আর যদি হয় টেলিভিশন তাহলে তো এক ফালি রোদের মত হাতের মুঠোয় পুরো বিশ্বকে পাওয়া। এমন ভাবনা বর্তমান সময়ে মিডিয়াতে কাজ করতে আসা তরুণ-তরুণীদের। তাদের চোখে মুখে বিস্ময়। তারা স্বপ্ন দেখে পুরো বিশ্বকে জয় করবার। এদিকে তরুণ-তরুণীরাই যে শুধু গণমাধ্যমে কাজ করার স্বপ্ন দেখে তা কিন্তু একদম নয়। কিন্তু এত পেশা থাকতে গণমাধ্যম পেশাকে কেন সবাই বেঁছে নিতে চাই?

কেননা গণমাধ্যম মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, বলতে, লিখতে, আলোচনা করতে, কোনো বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ করতে সাহায্য করে। এছাড়া গণমাধ্যম মানুষের মত প্রকাশের একটি অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। অন্যদিকে গণমাধ্যম সমাজ ও জাতির প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করে।

বিধায় বলা যায়, গণমাধ্যম একটি জনপ্রিয় পেশা হিসেবে সবার কাছে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু বর্তমানে গণমাধ্যমের হাল সম্পর্কেও জেনে নেওয়া দরকার….

আমি ক্যামব্রিয়ান শিশু-কিশোর ম্যাগাজিন ‘স্বপ্নঘুড়ি’র নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। ক্যামব্রিয়ান থেকে তখন সাপ্তাহিক ‘ম্যাগাজিনটি বের করা হয়। মূলত এটি একটি শিক্ষা ভিত্তিক ম্যাগাজিন। বিএসবি ফাউন্ডেশন পরিচালিত সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের নিকট হতে লেখা আহবান করা হয়। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কয়েকদিন পর হঠাৎ আমার রুমে এক শিক্ষার্থীর প্রবেশ। নাম নিপুন (ছদ্মনাম)। বাংলাদেশের প্রথম সারির নাম করা একটি অনলাইন পত্রিকায় শিশু সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেন। ইতোমধ্যে এই শিশু সাংবাদিক বাংলাদেশের নামকরা কয়েকজন খ্যাতনামা ব্যক্তির স্বাক্ষাৎকার নিয়েছেন। হাতে সেগুলোর প্রিন্ট কপিও রয়েছে। নাম, পরিচয় কিংবা কোনো প্রশ্ন করার আগেই মেয়েটি তার পরিচয় জ্ঞাপন করা শুরু করল। কথা বলার মধ্যে যতি কিংবা বিরাম চিহ্নের কোনো ব্যবহার খুঁজে পাওয়া গেল না। যখন এই শিশু সাংবাদিকের নিকট জানতে চাওয়া হলো, তুমি গণমাধ্যমে কতোদিন কাজ করো। জবাবে এই শিশু সাংবাদিকের উত্তর ১ বছরেরও অধিক সময়। এই প্রতিউত্তর শুনে আমার নির্বাক হওয়া ছাড়া কিছুই বলার নেই।

অবশেষে যখন জানতে চাইলাম কিভাবে তুমি এই নামকরা ব্যক্তিদের স্বাক্ষাৎকার নিয়েছো। তখন এই শিশু সাংবাদিকের নিরবতায় সবকিছু বোঝা হয়ে গেল। আসলে শিশু সাংবাদিক হোক আর যে সাংবাদিক ই-হোক না কেন সেই সংবাদকর্মীর যদি শিরোনাম, ইন্ট্রো, বডি এবং কিভাবে সংবাদটি তথ্য সমৃদ্ধ করতে হয় কিংবা সংবাদটি শেষ করতে হয় সেটা সম্পর্কে যদি সংবাদকর্মীর স্বচ্ছ ধারণা না থাকে তাহলে তিনি কিভাবে একজন সংবাদকর্মী হলেন? সংবাদকর্মীদের এই বেহাল দশার জন্য কে দায়ী? সেটার উত্তর-ই বা কে দিবেন? আর কেন-ই বা গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা দিন দিন বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

আসলে গণমাধ্যমের এই বেহাল দশার জন্য কারা দায়ী। যারা গণমাধ্যমে কাজ করেন তারা নাকি যারা অযোগ্য ব্যক্তিদের গণমাধ্যমে কাজ করার সুযোগ দেন তারা। একসময় ছিল যখন যোগ্যতা থাকলেই গণমাধ্যমে কাজ করার সুযোগ হতো। কিন্তু এখন যোগ্যতা থাকলেই গণমাধ্যমে সবার কাজ করার সুযোগ হয় না।  অন্যদিকে যোগ্যতাতো দূরে থাক, যদি কারো সুপারিশ করার মত আমলা থাকে তাহলে সে একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে প্রথম দিনেই গণমাধ্যম তকমাটা পেয়ে যায়। এই হচ্ছে বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের অবস্থা।

এবার আসি অন্য প্রসঙ্গে…। অভিজ্ঞতা থাকলেই কি সংবাদ উপস্থাপনে সুযোগ পাওয়া যায়? না। মুশরেফা (ছদ্মনাম) তিনি কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের নামকরা একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সংবাদ পাঠ করেছেন। মুশরেফার ( ছদ্মনাম) বাংলা কিংবা ইংরেজি দুই স্তরেই সংবাদ উপস্থাপনে রয়েছে সমান অভিজ্ঞতা। কিন্তু তিনি এখন কোনো টেলিভিশনে সংবাদ উপস্থাপনের সুযোগ পাচ্ছেন না। কিন্তু কেন? আর সেই কিন্তুর জবাব এখন একটাই নাচতে নেমে নাকি ঘোমটা দেওয়া। হয়ত ভাবছেন এটি আবার কেমন উত্তর। হ্যাঁ পাঠক বন্ধুরা এখন এই সংবাদ পাঠিকা মুশরেফা (ছদ্মনাম) কে প্রায় শুনতে হয় এই একটি কথা। আর এই জন্য যে, তিনি আগেও হিজাব পরিহিত অবস্থায় সংবাদ পাঠ করতেন। তাই এখনও  তিনি সেই হিজাব পরিহিত অবস্থায় সংবাদ পাঠ করতে চান। কিন্তু আমাদের দেশে যে কোনো টেলিভিশনের এখন  শর্ত একটাই আপনাকে হিজাব ছাড়া সংবাদ পাঠ করতে হবে। তাহলেই মিলবে আপনার সুযোগ। আসলে এমনটি কি গণমাধ্যমে হওয়া উচিত।

যদি কারো মধ্যে সংবাদ উপস্থাপনের গুণাবলী বিদ্যমান থাকে আর তিনি যদি অভিজ্ঞ হয়ে থাকেন তাহলে যেভাবে সংবাদ উপস্থাপন করুক না কেন তাতে কি কোনো সমস্যা আছে। যে দেশের শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষ মুসলিম, সেই দেশে একজন সংবাদ উপস্থাপক হিজাব পরে সংবাদ পরিবেশন করতে পারবেন না। এর চেয়ে আর কী দুঃখ হতে পারে! বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশে সংবাদ পাঠিকারা হিজাব পরে সংবাদ উপস্থাপন করেন। কিন্তু বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ হয়েও যারা এখানে হিজাব পরে সংবাদ উপস্থাপন করতে চান তাদের সেই আশা শুধুই স্বপ্ন, বাস্তবে নয়।

তবে বর্তমানে যারা হিজাব ছাড়া সংবাদ উপস্থাপন করছেন আমি তাদের বিরোধিতা করছি না। শুধু আমি আমার দেখা একটি বাস্তব চিত্রের বর্ণনা দেওয়ার চেষ্টা করেছি।

কিন্তু এখন প্রকৃত সংবাদকর্মীর চেয়ে ভূয়া সংবাদকর্মীর সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। অর্থের বিনিময়ে বাজার হতে যেমন সদয় পাতি কেনা যায় তেমনি এখন বাজারে প্রেস কার্ডও পাওয়া যায়। সম্পাদকের সঙ্গে যদি ভালো সম্পর্ক থাকে তাহলে তো আর কথায় নেই।

গণমাধ্যমে চাকরি হয় নিজের যোগ্যতায়। এই কথাটি এক সময় সত্য ছিলো। কিন্তু এখন এই কথাটি বিলুপ্তির পথে। বর্তমানে যোগ্যতায় নয়, গণমাধ্যমে উর্দ্ধতন কোনো পরিচিত ব্যক্তির সুপারিশে এখন চাকরি হয়। কাজ জানা কিংবা না জানা সেটি বড় কথা নয়। বড় কথা গণমাধ্যমে পরিচিত কোনো উর্দ্ধতন কর্মকর্তা আছে কিনা।

সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত কিংবা সাংবাদিকতা বিভাগ হতে পড়ালেখা শেষ করলেও এখন গণমাধ্যমে চাকরি যেন সোনার হরিণ। কেননা অন্য ফ্যাকাল্টি হতে পড়ালেখায় অধ্যয়নরত কিংবা পড়ালেখা শেষ করলে এখন গণমাধ্যমে চাকরি পাওয়া যায়। যদি তার সুপারিশের জোর থাকে।

গণমাধ্যমকে চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। গণমাধ্যমে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের একটি সার্বিক চিত্র আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে। ইলেকট্রনিক ও মুদ্রণ মাধ্যম এ দুই ধরনের গণমাধ্যম বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চালু আছে। আমাদের দেশও তার ব্যতিক্রম নয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী বিগত নব্বই দশকের গোড়া থেকে আমাদের দেশে গণমাধ্যমের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে এর পরিসর। একসময় ক্যাবল বিটিভি ও দু-একটি পত্রিকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল গণমাধ্যম।

গণমাধ্যমকর্মীরা প্রতিবাদী হবে, লড়াকু হবে, আপোসহীন হবে- এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। কিন্তু তা যদি গড্ডালিকা প্রবাহ হয় অথবা একটু নম্র করে বলতে গেলে বলতে হয়, দালালি বা ভাঁড়ামী হয় তাহলে সেটা কি গণমাধ্যমের পর্যায়ে পড়ে। হয়ত এটি ভাবার মত এখন কারো সময় নেই।

তাই আজ একটি কথা বলতে বড়ই ইচ্ছা করছে, গণমাধ্যম হোক সবার জন্য। মূল্যায়ন হোক অভিজ্ঞতার। একই হাতে হাত রেখে কাজ করার সুযোগ হোক সবার।

লেখক: সাংবাদিক এবং কলামিস্ট