সড়কে নৈরাজ্য : এ দায় কার – আমিনুল ইসলাম মিলন

দেশে কারা পরিবহন শ্রমিকের? না এ দেশের জনগণের? স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর এ প্রশ্ন আজ উচ্চকিত জোরালোভাবে। দেশটা আসলে আমি-আপনি-সাধারণ জনগণের নয়। দেশটা শ্রমিকের এবং শুধু পরিবহন শ্রমিকের। তাদের হাবভাব, আচার-আচরণ, কাজকর্ম দেখলে তাই মনে হয়। দিনে দিনে তাদের অভব্য আচরণ বেড়েই চলেছে। আইন না মানা তাদের মূলমন্ত্রে পরিণত হয়েছে। ফলে সড়কে বেড়েছে দুর্ঘটনা-মৃত্যুর মিছিল কেবলই দীর্ঘ হচ্ছে।

পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য সব সীমা অতিক্রম করেছে। জনগণ অসহায়-জিম্মি। এ অসহায় অবস্থা থেকে জনগণকে মুক্ত করার কোনো সাহসী উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। ঔদ্ধত্য কত বাড়লে পরিবহন শ্রমিকরা যাত্রী ও গাড়িচালকের শরীরে পোড়া মোবাইল লাগিয়ে দিতে পারে। একটি নয়, দুটি নয়- সারাদেশে গত দুদিনে এমন ঘটনা ঘটেছে শত শত- পুলিশের চোখের সামনে। সাধারণ মানুষকে গাড়ি থেকে নামিয়ে মারধর করা, লাঞ্ছিত করা, কান ধরে ওঠবস করা, ড্রাইভার ও যাত্রীর গায়ে-মুখে পোড়া মবিল লাগানোর মতো সীমাহীন ধৃষ্টতা দেখিয়েছে পরিবহন শ্রমিকরা।

কথায় কথায় ধর্মঘট ডাকা, কখনো অঞ্চলভিত্তিক, কখনো দেশব্যাপী, পরিবহন শ্রমিক নেতাদের নিত্য-রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। এ ধর্মঘটে বিপুল আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখায় সাত দিনের শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়ল না। তবে এর প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমাদের সন্তানদের পুলিশের চিরাচরিত বুটাঘাত সহ্য করতে হলো।

অথচ উপযুক্ত সব অপকর্ম ফৌজদারি অপরাধ। ফৌজদারি আইনে এসব অপরাধে কারাদ- ও অর্থদন্ডের বিধান রয়েছে। এমনকি আইনে এসব অপরাধের হুকুমদাতাদেরও শাস্তির বিধান রয়েছে। ফৌজদারি আইনে এসব অপরাধ সংঘটনের সময় তাৎক্ষণিক গ্রেপ্তারের বিধান থাকলেও আমরা পুলিশের তরফে এমন কোনো কার্যক্রম দেখিনি। ফলে পরিবহন শ্রমিকদের নৈরাজ্য চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। একবিংশ শতাব্দীর এমন উন্নত আধুনিক সময়ে ডিজিটাল বাংলাদেশে আমাদের এ অবমাননাও সহ্য করতে হলো।

কিন্তু করার কিছু নেই। এ নিয়েই বাংলাদেশে আছি এবং থাকতে হবে। বিদেশ পাড়ি দেওয়ার সামর্থ্য-সম্বল আমাদের নেই। কিন্তু এ থাকা না থাকারই নামান্তর। বাস-ট্রাক-টেম্পোর কন্ডাক্টর, হেলপারসহ রাজ্যের বখাটেরা যদি একটি দেশের রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে তা হলে সে দেশ ন্যূনতম সভ্য দেশের তালিকায় থাকে না। কিন্তু বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌম-গণতান্ত্রিক সুসভ্য দেশ। উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশ ক্রমাগত সাফল্য লাভ করছে।

অর্থনীতি-কৃষি-অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ-শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বাংলাদেশের রয়েছে ঈর্ষণীয় সাফল্য। বাংলাদেশ আজ সত্যিকার অর্থে ডিজিটালাইজড বাংলাদেশ। জাতিকে সঠিক ও গতিশীল নেতৃত্ব প্রদানের জন্য এ দেশের প্রধানমন্ত্রী আজ সারাবিশ্বে নন্দিত-প্রশংসিত। অনেকগুলো পদকে তার ভা-ার পরিপূর্ণ। প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এবং অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়ে তিনি বিশ্বে মানবতা ও মানবসেবার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন।

কিন্তু সরকারের এত উন্নয়ন, এত সাফল্য- কয়েকটি বিষয়ের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ, সমালোচিত। কিন্তু এ থেকে উত্তরণ কীভাবে? পরিবহন শ্রমিকের রাজা নৌমন্ত্রী শাজাহান। অন্যদিকে সড়ক পরিবহন সমিতির রাজা প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা। মন্ত্রিসভায় তাদের উপস্থিতিতে গত ৬ আগস্ট সড়ক পরিবহন আইন চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করে। অনুমোদনের সময় তারা কোনো বিরোধিতা করেননি। এমনকি গত ১৯ অক্টোবর জাতীয় সংসদে আইনটি পাস হওয়ার সময়ও তারা কোনো বিরোধিতা করেননি।

আইন প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে- মতামত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংসদে আইনটি পাস হওয়ার সাত দিনের মাথায় কেন এই কর্মবিরোতির নামে ধর্মঘট পালন হচ্ছে? একটি দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদে দেখলাম, গণপরিবহনে দৈনিক চাঁদা ওঠে ৬ কোটি টাকা, যা ভাগবাটোয়ারা হয় সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে। অর্থই সব অনর্থের মূল কিনা- সরকারকে সেটাও ভেবে দেখতে হবে। এভাবে চলতে পারে না, চলতে দেওয়া যায় না। কথায় কথায় ধর্মঘট-ভাঙচুর, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, কৃষিপণ্য সরবরাহে বিঘ্নতা, খাদ্যশস্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি, স্তব্ধ জনজীবন- আমরা আর দেখতে চাই না।

উন্নয়নের সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে হলে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়- এটি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের কথা। আজ আমাদের সব ক্ষেত্রে উন্নয়নের সাফল্যগাথা রয়েছে। এর সুফল পেতে হলে সব ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা অপরিহার্য। এ জন্য রাষ্ট্রকে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে হবে। যে কোনো নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর থেকে কঠোরতম হওয়ার সময় এসেছে। আজ থেকে ২৫০০ বছর আগে কৌটিল্য বলেছেন, যেখানে দ- নেই- সেখানে রাজ্য নেই। আমরা দ- চাই- সে যেই হোক না কেন।

আমিনুল ইসলাম মিলন
উপপেষ্টা সম্পাদক- দৈনিক বাঙলার জাগরণ

সাবেক প্রধান তথ্য কর্মকর্তা