সামুদ্রিক প্রলয় ফণীর ক্ষয়ক্ষতি ও শিক্ষা

বিগত ২৮ এপ্রিল বাংলা সাগরের দক্ষিণে সুমাত্রা দ্বীপের পশ্চিমে একটি সামুদ্রিক নিম্নচাপ ঘনীভূত হয়ে প্রলয় (Cyclone) আকার নেয়, যা ‘ফণী’ নামে উত্তরমুখী পথে এগোতে থাকে। ১ মে নাগাদ প্রলয়টি ভারতের ওডিশা উপকূলের কাছে পৌঁছায়, যখন তীব্রতার কারণে একে ৩ ক্যাটাগরির প্রলয় আখ্যা দেওয়া হয়। ২ মে প্রলয়টির কেন্দ্রে ২০০ কিলোমিটার বায়ুবেগ থাকায় একে ৪ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়। ৩ মে শুক্রবার সকাল ৮টায় ফণী ১৮৫ কিলোমিটার বায়ুবেগ নিয়ে ওডিশা উপকূল দিয়ে ভূমিতে প্রবেশ করে। এর পরপরই ফণী দ্রুত তার তীব্রতা হারিয়ে ১ ক্যাটাগরিতে নেমে আসে। রাত ৮টা নাগাদ প্রলয়টির কেন্দ্র কলকাতার দক্ষিণ দিয়ে যায়। রাত ১০টা নাগাদ বাগেরহাট হয়ে উত্তরমুখী হয়। ৪ মে সকাল ৬টা নাগাদ এর কেন্দ্র ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে ও বিকেল নাগাদ নরসিংদীর পথে গিয়ে মিলিয়ে যায়। ফণীর প্রভাবেই শুক্রবার দুপুর থেকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে বৃষ্টি শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে সন্ধ্যা নাগাদ ৫০ থেকে ৮০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ও বইতে থাকে।

প্রলয় ফণী আসার আগে এর পূর্বাভাসে যা পাওয়া যাচ্ছিল, তাতে এ প্রলয়টি অতি ভয়ঙ্কর কিছু বলে ধারণা করা হয়েছিল। সরকারের দুর্যোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনা থেকে সে রকম প্রস্তুতিই নেওয়া হয়েছিল, যাতে জানমালের ক্ষতি না হয়। এ যাবৎ ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও বরগুনায় কয়েকটি স্থানে বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হয়েছে এবং ঘর ও গাছের তলায় পড়ে কিছু লোকের মৃত্যু হয়েছে। ভারতে মৃত্যুসংখ্যা কমবেশি ৩৫, বাংলাদেশে কমবেশি ১৫। যে বিশাল ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, তা হয়নি। সারাদেশে বোরো মৌসুমের ধান এখনও কাটা সারা হয়নি। কিন্তু ফসলহানি তেমন হয়নি।

বাংলাদেশের উপকূলে আছড়ে পড়া সামুদ্রিক প্রলয়গুলো বিশ্নেষণ করলে দেখা যায়, বর্ষার আগে আসা প্রলয়গুলো মোটামুটি চট্টগ্রাম উপকূল দিয়ে যায়। বর্ষাকালে বরিশালের ওপর দিয়ে ও বর্ষার শেষের প্রলয়গুলো সাতক্ষীরার ওপর দিয়ে যায়। এর কারণ, শীত ও বসন্তকালে গাঙ্গেয় অববাহিকায় বাতাসের আঞ্চলিক প্রবাহ উত্তর থেকে দক্ষিণে এবং বর্ষা ও শরৎকালে দক্ষিণ থেকে উত্তরে বইতে থাকে। এই দুইয়ের মাঝে হেমন্ত ও গ্রীষ্ফ্মকালে বাতাসের প্রবাহের দিক পরিবর্তন হয় এবং সুন্দরবনকে ঘিরে দোদুল্যমান থাকে। এ কারণেই গ্রীষ্ফ্মকালে সৃষ্ট বাংলা সাগরের প্রলয়গুলো ঘনীভূত হয়ে উত্তর দিকে এগিয়ে গেলে হয় ওডিশা উপকূলে গিয়ে পড়ে, নয় আরও একটু ওপরে উঠে পশ্চিমের বায়ুপ্রবাহের চাপে ঘুরে চট্টগ্রাম উপকূলের দিকে যায়। বর্ষাকালে মৌসুমি বায়ুর কারণে বাতাসের প্রবাহ স্পষ্ট উত্তরমুখী বিধায় প্রলয়গুলো মেঘালয় পর্যন্ত ধেয়ে যায়। মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের ফিরতি পথে শরতের শেষে সৃষ্ট প্রলয়গুলো সাতক্ষীরার ওপর দিয়ে এবং হেমন্তের প্রলয়গুলো বরিশাল হয়ে যায়। এ কারণেই প্রলয় ফণীর প্রবাহপথ নিয়ে দেওয়া পূর্বাভাস আমার পছন্দ হয়নি।

বিগত ২ মে বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার পথে বিকেল ৪টা নাগাদ আমার সামনেই পাটুরিয়া ঘাটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হলো। আকাশ পরিস্কার; কিন্তু জানতে পারলাম, আজ রাতেই ফণী ওডিশা উপকূলে আঘাত হানবে। তাই ৭ নম্বর বিপদসংকেত ও অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল বন্ধ। পাটুরিয়া ঘাট থেকে ওডিশা উপকূল ৭০০ কিলোমিটার দূরে। এমনকি সাতক্ষীরা থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে। এত আগেভাগে সরকারি নির্দেশে সারাদেশের অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল বন্ধ করার কোনো যৌক্তিকতা আমি পাই না। টিভি মিডিয়ায় বলা হচ্ছিল, এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ফণী খড়গপুর, নদীয়া হয়ে রাজশাহী দিয়ে দিনাজপুর পর্যন্ত যাবে। আমার কাছে এ পূর্বাভাস মোটেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। পরদিন শুক্রবার দুপুর ২টায় চুয়াডাঙ্গায় বৃষ্টিপাত শুরু হলো। কিন্তু ঝড় ছিল না। ফেসবুকে খবর এলো, উপকূলে কোনো মেঘ নেই।

আমার ধারণামতে, যা ঘটার, আসল ঘটনাটি তার ধারেকাছে দিয়েই গেছে। ফণী ওডিশা উপকূলে পড়ে উত্তরে এগিয়ে যাওয়ার পথে দুর্বল হয় ও পশ্চিমের আঞ্চলিক বায়ুপ্রবাহের চাপে পূর্বদিকে মোড় নেয়। শুক্রবার বিকেল নাগাদ ভারতের মিডিয়াতে বলা হচ্ছিল, ফণী দিঘা থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে আছে ও খড়গপুরের ওপর প্রবল আঘাত হানবে। কিন্তু ওই সময় ফণীর কেন্দ্রটি সুন্দরবনের দিকে এগোচ্ছে। রাত ৮টা নাগাদ এটি খুলনার দক্ষিণে এবং ১০টা নাগাদ বাগেরহাট পার করে। শনিবার সকালে ফণী অনেক দুর্বল হয়ে ঢাকার দক্ষিণ-পশ্চিমে ছিল। অথচ দুর্যোগ ব্যবস্থামন্ত্রী টিভিতে বললেন, ফণী দিনাজপুর পর্যন্ত যাবে। ফণী দুপর নাগাদ নরসিংদীর দিকে গিয়ে মিলিয়ে যায়।

ফণী যখন এলো, তখন মাঠে ধান; বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের বাঁধগুলোর নির্মাণ কাজ চলছে। অনেক বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত, অনেক জানমাল যেতে পারত। সরকারিভাবে দুর্যোগ মোকাবেলার একমাত্র লক্ষ্য ছিল স্থানীয় জনগণকে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া। কিন্তু স্থানীয় মানুষেরা নিজস্ব জ্ঞানবোধ দিয়ে আকাশে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া না দেখে ঘর ছাড়েনি।

প্রলয় ফণী এসেছে এবং বাঁধ ভেঙে অনেক স্থানের ফসল তলিয়েছে। এসব স্থানে বাঁধ দুর্বল ছিল। প্রশ্ন উঠছে, দুর্বল বাঁধগুলো কেন আগেভাগে মেরামত করা হয়নি? আমার প্রশ্ন অন্যভাবে, আমাদের জুলাই-জুনের অর্থবছর কেন এক কোয়ার্টার এগিয়ে এনে বাঁধগুলো চৈত্র মাসের মধ্যে মেরামত করা হয় না? আমি কয়েক যুগ ধরে বাংলাদেশের অর্থবছর পাকিস্তানের মতো না রেখে ভারতের মতো এপ্রিল থেকে মার্চ করার (বাংলা অর্থবছর) প্রস্তাব দিয়ে আসছি। এটা হলে ঝড়, বন্যা আসার আগেই উপকূলীয় বাঁধ, হাওরের বাঁধ মেরামত হয়ে যায়। এপ্রিল থেকে মার্চ অর্থবছর হলে সরকারের উন্নয়ন কাজে জুন মাসে তাড়াহুড়ো করা লাগে না। বর্ষার মধ্যে কাজ শেষ না করেই কাজ সমাপ্ত দেখিয়ে বিল তুলে নেওয়ার প্রয়োজন হয় না। প্রলয় ফণী একটা বিশেষ শিক্ষা দিয়ে গেল- বাঁধগুলো যতই পরিবেশবিরোধী আখ্যা দেওয়া হোক না কেন; সারাদেশের বাঁধগুলোই বন্যা উপদ্রুত সাধারণ মানুষের আশ্রয়ের প্রধান স্থল। সরকার গরু-ছাগল বন্যা থেকে রক্ষার জন্য যেসব কেল্লা নির্মাণ করছে, সেগুলো এই বাঁধসংলগ্ন করে নির্মাণ করলে এবং বাঁধের পাশে উঁচু ভিটায় গ্রামগুলোকে নির্মাণ করতে উৎসাহ দিলে অনেক ভালো হবে।

প্রকৌশলী; সাবেক মহাপরিচালক, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা