বোর্ড ও কলেজে ছোটাছুটি শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের

এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশের পরদিনই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ছোটাছুটি শুরু হয়েছে। কাক্সিক্ষত ফল না হওয়ায় তা চ্যালেঞ্জের প্রস্তুতির জন্য কেউ কেউ যাচ্ছেন বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে।

আবার ভর্তির যোগ্যতা সম্পর্কে জানতে কেউ কেউ কাক্সিক্ষত কলেজে যাচ্ছেন। ফল প্রকাশের ১২ ঘণ্টা পর সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে দেশসেরা নটর ডেম কলেজে অনলাইনে ভর্তির আবেদন নেয়া শুরু হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য জানতে মঙ্গলবার কলেজে কলেজে ভিড় করছেন শিক্ষার্থীরা। পছন্দের কলেজে ভর্তির যোগ্যতা সম্পর্কে বিশেষ করে কত জিপিএ চাওয়া হবে সে সম্পর্কে তারা জানতে চান।

কারণ নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তির মেধাক্রম তৈরি করা হলেও শিক্ষার্থীর আবেদনের যোগ্যতা জিপিএ’র ভিত্তিতে উল্লেখ করা হয়। ঢাকা কলেজে রাজধানীর নাজিমউদ্দীন রোডের বাসিন্দা সাকিব ইসলাম জানান, তিনি ওয়েস্ট অ্যান্ড হাইস্কুল থেকে এবার পাস করেছেন।

ঢাকা কলেজে তিনি ভর্তি হতে চান। কিন্তু ফল একটু খারাপ। মানবিক বিভাগ থেকে তিনি জিপিএ-৪.৬৩ পেয়েছেন। নটর ডেম কলেজ, সেন্ট যোসেফ ও হলিক্রস কলেজেও শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর নিতে দেখা গেছে।

চার বছর ধরে কলেজে কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইন ও এসএমএসে আবেদন নিয়ে ভর্তি করা হচ্ছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য ভর্তি পরীক্ষা থেকে শিক্ষার্থীদের মুক্ত রাখা। তবে সরকারি নীতিমালাকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করে তিনটি প্রধান কলেজ ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে আলাদাভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে।

এবারও সেই প্রক্রিয়া কলেজগুলো অনুসরণ করছে কিনা, সেটাই জানতে চান শিক্ষার্থীরা। মঙ্গলবার দুপুরে নটর ডেম কলেজে রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ থেকে পাস করা ছাত্র রিফাত চৌধুরী জানান, তার ইচ্ছা তিনি এ কলেজে পড়বেন। এজন্য জানতে এসেছেন কলেজটি এবার কোনো প্রক্রিয়ায় ভর্তি নেবে এবং কবে থেকে আবেদন ফরম বিতরণ করা হবে।

ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক যুগান্তরকে বলেন, এবারও অনলাইন ও এসএমএসে আবেদন নিয়ে ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। ১২ মে এ প্রক্রিয়া শুরু হবে। ইতিমধ্যে ভর্তি নীতিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন বোর্ডের ওয়েবসাইটে নীতিমালা পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, সব প্রতিষ্ঠানকে এ নীতিমালা অনুযায়ী ভর্তি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

নটর ডেমে আবেদন শুরু : এবারও নটর ডেম কলেজ আলাদাভাবে ভর্তি প্রক্রিয়া শুরু করেছে। মঙ্গলবার প্রথম প্রহর থেকে কলেজটি ভর্তি আবেদন নেয়া শুরু করেছে। ১৩ মে রাত ১২টা পর্যন্ত কলেজটি অনলাইনে আবেদন নেবে। তবে ১৪ মে পর্যন্ত দুপুর ১২টা পর্যন্ত বিকাশে টাকা জমা দেয়া যাবে।

দুটি ওয়েবসাইট (http://ndc.mbilladmission.com,ww w.notredamecollege-dhaka.com) থেকে আবেদন করা যাচ্ছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিয়ে ভর্তির কার্যক্রম শুরু করেছে বলে জানিয়েছে কলেজটি। আবেদন বাবদ প্রতিষ্ঠানটি ২৬০ টাকা নিচ্ছে। বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির জন্য জিপিএ-৫, মানবিকে জিপিএ-৩ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় জিপিএ-৪ পেতে হবে।

বিভাগ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ব্যবসায় শিক্ষায় যেতে চাইলে বিজ্ঞান থেকে জিপিএ-৪.৫ আর ব্যবসায় শিক্ষা থেকে মানবিকে যেতে চাইলে জিপিএ-৩.৫ পেতে হবে। প্রতিষ্ঠানটি এবার বিজ্ঞানে ২০৮০ জন, মানবিকে ৪০০ এবং ব্যবসায় শিক্ষায় ৭৫০ জন ভর্তি করাবে। ১৭ মে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ১৬ মে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় আবেদনের আইডি নম্বর অনুযায়ী লিখিত পরীক্ষার সময় ও কক্ষ নম্বর প্রকাশ করা হবে।

হলিক্রস কলেজ : হলিক্রস কলেজ মঙ্গলবার ভর্তি বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। আগামী ৯ মে থেকে ১২ মে পর্যন্ত কলেজ থেকে আবেদন ফরম কিনে ১০ থেকে ১২ মে তা জমা দিতে হবে। আবেদন ফরমের দাম ২০০ টাকা। ১৭ মে বিজ্ঞান বিভাগ, ১৯ মে বিজনেস স্টাডিজ ও মানবিক বিভাগের ভর্তি পরীক্ষা নেয়া হবে। ২৬ মে পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে। এরপর ওই দিন এবং পরদিন ২৭ মে ভর্তি হতে হবে। বিজ্ঞানে ৭৫০ জন, বিজনেস স্টাডিজে ২৮০ এবং মানবিকে ২৭০ জন ভর্তি করা হবে।

শিক্ষা বোর্ডে ধরনা : মঙ্গলবার সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বোর্ডে খিলগাঁওয়ের এক ছাত্রীর সঙ্গে কথা হয়। তার সঙ্গে আরও তিনজন ছিলেন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছেন ওই ছাত্রী। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কক্ষে ঢোকার সময়ে দেখা যায় ছাত্রীর মা কান্না করছেন। ছাত্রীটির বাবা জানান, আবেগাপ্লুত তার স্ত্রী। সোমবার সারারাত ঘুমাননি।

এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাদের মেয়ে ইংরেজিতে জিপিএ-৫ পাননি। তাই গোল্ডেন (সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পাওয়া) ছুটে গেছে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল আরেক ছাত্রীকে। তার সঙ্গে মা ও বড় ভাই এসেছেন। তিনিও জিপিএ-৫ পাননি। গণিত, ইংরেজি এবং ধর্ম ও নৈতিকতায় জিপিএ-৫ পাননি। রাজধানীর মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ছাত্রীটি এসএসসি পাস করেছে। এভাবে বেশকিছু শিক্ষার্থী ও অভিভাবক ফলাফল সংক্রান্ত আপত্তি ও অনুযোগ নিয়ে বোর্ডে যান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফল প্রকাশের পরদিন এভাবে দেশের আটটি সাধারণ বোর্ডেই ফলাফল নিয়ে অসন্তুষ্টরা ভিড় করেছেন। এসব ব্যক্তির মধ্যে কেউ রাজনীতিবিদ, আবার কেউবা সরকারি কর্মকর্তা। আছেন সাংবাদিক ও প্রকৌশলীসহ বিভিন্ন পেশার প্রভাবশালীরা। কেউ জিপিএ-৫ না পাওয়া, ভালো পরীক্ষা দিয়েও একেবারে ফেল করার নালিশও নিয়ে এসেছেন অনেকে।

অতীতে পরীক্ষক ও টেবুলেটরদের ভুলের শিকার হতে দেখা গেছে অনেক শিক্ষার্থীকে। এ কারণে রেজাল্ট চ্যালেঞ্জ করে পরে জিপিএ-৫ পাওয়ার ঘটনাও আছে। এসব কারণে অনেক শিক্ষার্থীই ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করছেন।

ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক আবুল বাসার জানান, ফলাফল পুনঃনিরীক্ষার বিষয়টি পুরনো। পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর একটা সময়ের জন্য এ লক্ষ্যে আবেদনের সুযোগ দেয়া হয়। এবারও ১৩ মে পর্যন্ত আবেদন নেয়া হবে। আগে বোর্ডগুলোতে সশরীরে এসে ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদন করতে হতো। এখন টেলিটকে এসএমএসেই আবেদন করা যায়। আবার মোবাইলে এসএমএসেই ফল জানিয়ে দেয়া হবে। তবু অভিভাবকরা চলে আসছেন। আসলে টেনশন ও আবেগ থেকে তারা আসছেন।

জানা গেছে, পুনঃনিরীক্ষার ক্ষেত্রে খাতা পুনরায় মূল্যায়ন হয় না। শুধু মূল্যায়িত খাতাটিতে সব প্রশ্নের উত্তরে নম্বর দেয়া হয়েছে কিনা, দেয়া নম্বর ঠিকমতো গণনা করা হয়েছে কিনা, প্রাপ্ত নম্বর পরীক্ষক ঠিকমতো ওএমআর ফরমে লিখেছেন কিনা এবং সেই লেখা অনুযায়ী বৃত্ত ভরাট করেছেন কিনা- এ চারটি দিক শুধু দেখা হয়।

ঢাকা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক বলেন, এ চারটি দিক দেখা হলেও অনেক ক্ষেত্রে ভুল ধরা পড়ে। আসলে ভুলভ্রান্তি মানুষেরই হয়ে থাকে। সেই ভুলের খেসারত যাতে কাউকে না দিতে হয় সে জন্যই এ পুনঃনিরীক্ষার ব্যবস্থা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বোর্ডের প্রবিধানমালায় খাতা নতুন করে পুনঃমূল্যায়নের বিধান না থাকায় তারা কেবল পুনঃনিরীক্ষার কাজ করে থাকেন। এ প্রক্রিয়ায়ও অনেকের ফলাফল উন্নয়ন হয়।

এবারের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল একটু ব্যতিক্রম হয়েছে। পাসের হার বাড়লেও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। এক লাখ পাঁচ হাজার ৫৯৫ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে। তিন লাখ ৭৮ হাজার ৬৫০ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।