ফয়েজ আহমদ এবং চেতনার পোস্টমর্টেম! : তাহেরা বেগম জলি

ফয়েজ আহমদ। তাঁকে পরিচিত করাতে কোন বাড়তি কথার দবকার হয়না। তিনি আমাদের ফয়েজ ভাই। তাঁর জীবনের শেষের তিন বছর-আমি তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। তাঁর নির্দেশ মতো কাজ করার বিরল সৌভাগ্যও আমার হয়েছে। তিনি ছিলেন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি। আমি ছিলাম ঐ কমিটির সদস্য। আরো কয়েকজন সহ, হায়দার আনোয়ার খান জুনো ছিলেন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড প্রতিরোধ কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে-জানুয়ারি ২ তারিখে, ‘স্বোপার্জিত স্বাধীনতা’ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি কমরেড সিরাজ সিকদার হত্যার বিচার চেয়েছেন। ফয়েজ আহমদ দেশের নানান কঠিন সময়ে, বড় ধরণের রাজনৈতিক সমীকরণ মিলতে কখনো কখনো নিয়ামক শক্তি হয়ে উঠেছেন।

তারপর যথারীতি আবার তিনি এসে দাড়িয়েছেন সাধারণ মানুষের কাতারে। সেই দুরন্ত পথিক আমাদের ফয়েজ ভাই কোনদিন নৌকার যাত্রী ছিলেননা। তিনি কত বড়স্তরের সাংবাদিক ছিলেন, তা মেপে দেখার ধৃষ্টতা বোধকরি আমাদের কারো নেই। অন্যদিকে তিনি ছিলেন শিশু সাহিত্যিক, ছড়াকার, গণসংগীত রচয়িতা এবং ছিলেন মিছিলের সেই সৈনিক, যারা জীবন বাজি রেখে দাঁড়িয়ে যায় মৃতুর মুখোমুখি। অকৃতদার ফয়েজ আহমদ জীবনের শেষদিন পর্যন্ত জনমত গড়ে তুলেছেন সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে।

বাম রাজনৈতিক কাজে যুক্ত থাকার প্রমাণে তাঁকে কারাযাপন করতে হয়েছে বছরের পর বছর। চোখের সামনে দেখেছেন মুচলেকা দিয়ে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসছেন কেউ কেউ। কিন্তু তিনি তা করতে অস্বীকার করেছেন। জেল মুক্তির পর, দিনের পর দিন তাঁকে থাকতে হয়েছে রাষ্ট্রশক্তির ( পাকিস্তান) নজরবন্দী হয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হতেই প্রেসক্লাবের ভিতর তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

সেখান থেকে আহত অবস্থায় পালিয়ে যেতে তিনি সক্ষম হন। তারপর স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রতিটা দিনের সঙ্গে তাঁর নাম লেখা আছে স্বর্নাক্ষরে। সেই প্রবাদ প্রতিম পুরুষ-মধ্য রাতের অশ্বারোহী ফয়েজ আহমদ নৌকার যাত্রী ছিলেননা। এই না থাকা বিষয়ে তিনি বরং গৌরব বোধ করতেন। এবং এটা ছিলো তাঁর নৈতিক সিদ্ধান্ত। ফয়েজ আহমদের মত শুদ্ধ মানুষ বছরে বছরে জন্মায়না। আমাদের সেই ফয়েজ ভাই নিজের মেধাকে একাকার করেছেন এদেশের গরীব মানুষের ঘামের গন্ধের সঙ্গে। নৌকাকে তিনি ঠিকানা হিসেবে মেনে নেননি। যুব বয়সে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন দেশের প্রান্তে প্রান্তে। তিনি মাথা উঁচু করে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন নৌকার যাত্রী হওয়ার আহ্বান। তাহলে ? তিনি তবে দেশের কোন চেতনার প্রতিনিধি?